ক্রিকেটের সর্বকালীন ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ দলগুলির মধ্যে সবার প্রথমে যেই নামটি আসবে সেটি সত্তর থেকে মধ্য নব্বই দশকের পরাক্রমী ক্যারিবিয়ানদের কথা। ক্রিকেটপ্রেমী মিলেনিয়ালদের কাছে সেই অপ্রতিরোধ্য দলের দামাল ক্রিকেট চাক্ষুষ দেখার সুযোগ বিশেষ আসেনি, তবে ৯০ এর শেষের দিক থেকে স্টিভ ওয়া ও পরবর্তীতে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বে যে অস্ট্রেলিয়াকে আমরা দেখেছি তাতে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সাথে একমাত্র তুলনীয় তারাই হতে পারে। দেশের মাটিতে বা বিদেশে, টেস্ট বা ওডিআই (তখনও আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি দিনের আলো দেখেনি) যে কোনও কন্ডিশনে, যে কোনও ফর্ম্যাটে অপরাজেয় ছিলো সেই দল।
সেই প্রবলপ্রতিপক্ষকেও একটি ম্যাচে আনকোরা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় শত যোজন পিছিয়ে থাকা এক দলের ১১ জন হার মানা বাঙালির কাছে পরাভূত হতে হয়েছিলো। এমন নয় যে সেই জয়ের পর সেই দুর্বল দলটির খেলায় বৈপ্লবিক কোনও বফল এসেছিলো বা এই হারের পরেই সেই দুর্জয় অস্ট্রেলিয়া দলের পতনের সূচনা হয়েছিল। তবুও, সেই দিন, অর্থ্যাৎ ২০০৫ এর ১৮ই জুন ইংল্যান্ডের কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্স মাঠে যে অঘটনের সাক্ষী হয়েছিল ক্রিকেট বিশ্ব তা কোনও রূপকথার চাইতে কম নয়।
বলাই বাহুল্য অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ দলটি ছিলো বাংলাদেশ। এই ম্যাচটিতে খেললে মাঠে নামার মুহূর্ত অবধি বাংলাদেশ টেস্ট খেলিয়ে দেশগুলির বিরুদ্ধে কেবলমাত্র ৩ টি ওডিআইতে জিতেছিলো। তার মধ্যে একটি দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে হলেও বাকী দুটি যথাক্রমে ২০০৩ বিশ্বকাপের রানার্স আপ টিম ইন্ডিয়া এবং অন্যটি পাকিস্তান (১৯৯৯ বিশ্বকাপের গ্রুপ লীগের ঐতিহাসিক সেই ম্যাচ)।
এহেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে তোলে ২৪৯/৫, মূলত ড্যামিয়েন মার্টিন (৭৭) ও মাইকেল ক্লার্ক (৫৪) ছাড়া সেদিন আর কোনও অজি ব্যাটসম্যান তেমন দাগ কাটতে পারেননি। স্বপ্নের ফর্মে থাকা রিকি পন্টিংকে এলবিডাব্লিউ আউট করেছিলেন আনকোরা তাপস বৈশ্য।
জবাবে গ্লেন ম্যাকগ্রা ও জেসন গিলেস্পি পেস যুগল সমন্বিত অস্ট্রেলীয় বোলিংয়ের বিরুদ্ধে দুই ওপেনার জাভেদ ওমর (৫১ বলে ১৯) ও তুষার ইমরান (৩৫ বলে ২৪) সাবধানী ব্যাটিং করেন; তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল উইকেট পরে রানের গতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শুরুর উইকেট বাঁচিয়ে রাখা। তুষার আউট হতে তিন নম্বরে নামেন তৎকালীন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিস্ময়প্রতিভা মহম্মদ আশরাফুল আর মূলত তার মারাকাটারি ব্যাটিংয়ের উপর ভর করে রান রেট বাড়তে থাকে বাংলাদেশের। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার (৭২ বলে ৪৭)। এই দু’জনের জুটিতে ১৩৮ বলে ১৩০ রান ওঠে।
দলের রান যখন ২০২, অধিনায়ক বাশার রান-আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরলেও আশরাফুল বরফশীতল মস্তিষ্কে খেলা চালিয়ে যান ও ৪৭ তম ওভারের শেষ বলে নিজের শতরান পূর্ণ করেন এবং পরের বলেই যখন আউট হন, জেতার জন্য তখনও ১৭ বলে ২৩ রান বাকি।
সেখান থেকে ব্যাটন হাতে তুলে নেন আফতাব আহমেদ ও মহম্মদ রফিক। দু’জনেই অপরাজিত থেকে (যথাক্রমে ১৩ বলে ২১* ও ৭ বলে ৯*) বাকী রান তুলে তাঁদের দেশকে এক ঐতিহাসিক জয় উপহার দেন।
সেই যুগের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া দলের যে আধিপত্য ছিলো সেই নিরিখে উক্ত ম্যাচের ফলাফলের অভিঘাত শুধু তৎকালীন বাংলাদেশ নয়, দুনিয়ার আপামর ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে কতটা গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ তা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি একমাত্র তারাই করতে পারবে যারা সেই সময়ের ক্রিকেটের হালহকিকত সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিফহাল ছিলেন। বিস্মিয়ের ঘোর আজও কাটে না।
পরিশেষে বলা যায়, সেই ম্যাচের নায়ক মহঃ আশরাফুল, যার শতরানের উপর ভর করে এই ঐতিহাসিক জয় অর্জন করেছিল বাংলাদেশ, কখনওই নিজের অসামান্য প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। পরবর্তীতে খারাপ ফর্মের কারণে দল থেকে বাদ পড়েন এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে লীগে গড়াপেটার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আজীবন নির্বাসিত হন। এক অসীম সম্ভাবনার অঙ্কুর কখনওই ডালপালা মেলতে পারলো না।















মন্তব্য করুন
মন্তব্য দেখুন