‘Did I entertain you?’

‘উই ডোন্ট প্লে ফর ফান। ক্রিকেট একটা আর্ট, আয়ত্ত করতে সাধনা লাগে। দুরকমের ক্রিকেটার হয়, একদল ব্যাটকে কোদাল ভাবে, বাকিরা ভাবে সেতার। একদল কুলি, অন্যরা আর্টিস্ট।’

লিখেছিলেন মতী নন্দী, তাঁর ‘ননীদা নট আউট’ উপন্যাসে। আমরা ছোট থেকে যারা ক্রিকেট খেলা দেখে, শিখতে, ভালোবাসতে বাসতে বেড়ে উঠেছি তারা জানি এই উক্তি যে ক’তিপয় ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে একেবারে tailor made বলা চলে তাঁদের মধ্যে একেবারে প্রথম দিকে নাম থাকবে ত্রিনিদাদের রাজপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারা।

লেগ বা মিডল লেগে গার্ড নিয়ে বোলারের হাত থেকে বল release হবার পর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে অফস্টাম্পে শাফল করে, প্রায় হাঁটু মুড়ে নটরাজের বিভঙ্গে হাই ব্যাকলিফট, অতঃপর অবন ঠাকুরের তুলির টানের মতো মসৃণ স্ট্রোক প্লে। যারা সে দৃশ্য দেখেছে, তারাই জানবে। সত্যি বলতে সেই সৌন্দর্য অবর্ণনীয়।

গতকাল ৫১-এ পা দিয়েছিলেন। পোর্ট অব স্পেনে তাঁর ৩৭৫, সেই রেকর্ড হাতছাড়া হবার অব্যবহিত পরে আবার সেই একই মাঠে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৪০০* থেকে রেকর্ড পুনরুদ্ধার এ সবারই জানা। তবে তাঁর সেরা ইনিংসগুলির মধ্যে পরিস্থিতির প্রতিকূলতা, বিপক্ষ বোলিং অ্যাটাকের মান ইত্যাদির নিরিখে যেইগুলি সবার উপরে থাকবে তার মধ্যে থেকে প্রথম পাঁচটি আজ আমরা এক ঝলকে দেখে নেবো। রইলো প্রিন্স অব ত্রিনিদাদের কিছু মহাকাব্যিক ইনিংসের হাইলাইটসের লিঙ্ক।

১) ঘরের মাঠে সাউথ আফ্রিকার কাছে ঘরের মাঠে ০-৫ তে সিরিজ হার, পরের সিরিজে পরাক্রমী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে লজ্জাজনক হারের পর যখন কেরিয়ারের সবচেয়ে সঙ্কটকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছিলেন তখনই আবার উইলো কাঠের এস্রাজে তুললেন সুর। প্রবল চাপের মুখে দ্বিতীয় টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে ৩০৮ রান তাড়া করার পথে উল্টো দিকে টেইল এন্ডারদের নিয়ে এক উইকেটে জিতিয়েছিলেন দলকে।

২) বয়স তখন মাত্র ২৩। এর আগে মাত্র ৫ টি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা, মোট রান ২৪৪। মার্ভ হিউজ, ম্যাকডারমট সমন্বিত পেস অ্যাটাকের সামনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫০৩ রানের জবাবে খেলতে নেমে ২৭৭ রানের এই সাবলাইম নক। রান আউট না হলে হয়তো সেদিন আউট করা যেতো না। অল্পের জন্য ৩০০ ফেলে এসেছিলেন।

৩) সাদা পোশাকের ধ্রুপদী ক্রিকেটের পর এবার এবার রঙীন পোশাকের এক দিনের ক্রিকেট। ১৯৯৬ সালের উপমহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এই ইনিংস। সংহার মূর্তিতেও শিল্পের ছোঁয়া অমলিন।

৪) একই প্রতিপক্ষ, একই মঞ্চ, কিন্তু ৭ বছরের ব্যবধানে। ২০০৩ তিনের বিশ্বকাপ, আয়োজক দেশে। প্রথম পাঁচ ওভারের মধ্যেই দলের প্রথম উইকেটে পতন। এনটিনি, পোলকের বিষাক্ত স্পেল সামলে থিতু হয়ে তারপর সোজা ফিফথ গিয়ারে। রইলো তার ঝলক।

৫) আবার টেস্টে ফিরি, একদিনের ক্রিকেটে ৯০ এর দশক থেকে নিজেদের অন্যত্ম শিক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও টেস্টে শ্রীলঙ্কা কখনওই কুলীন দেশ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে ২০০০ সালে বিশ্বত্রাস হয়ে ওঠা মুরলীর সামনে সব দেশের ব্যাটসম্যানই নাকানিচোবানি খেয়েছেন। মূলত মুরলীর কেরিয়ারের পার্পল প্যাচের জেরেই সেই সময়ে ঘরের মাঠে অপরাজেয় হয়ে ওঠে শ্রীলঙ্কা। সেই মুরলীকে অবলীলায় খেলে তিন ম্যাচের সিরিজে করেছিলেন ৬৮৮, যদিও দল হেরেছিলো সিরিজ ০-৩ ব্যবধানে।

পরিশেষে বলি, যে কোনও ফর্মেই একজন শিল্পীর সাফল্যের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিক্তিই হলো তাঁর নান্দনিকতা, তিনি মানুষকে কতটা আনন্দ দিয়েছেন। নিজের বিদায়ী ম্যাচের পর একটি বাক্যেই নিজের কেরিয়ারের সারমর্ম ব্যক্ত করেছিলেন ত্রিনিদাদের রাজপুত্র। ‘ডিড আই এন্টারটেইন ইউ?’ উত্তর নিষ্প্রয়োজন।