শুভ জন্মদিন, স্রষ্টা

মহাস্রষ্টা আজ ৯৯ পূর্ণ করে শততম বর্ষে পদার্পণ করলেন আমরা সকলেই জানি । দস্তুর মেনে সকলেই তাঁরই বিভিন্ন সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন, ট্রিবিউট জানাচ্ছেন। আমরা অবিশ্যি সেই একই পথ অনুসরণ করার জন্য ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে বসে নেই। আবার সত্যি বলতে কী…কতকটা তাই।

তিনি একাধারে বিশ্ব্যবরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, তাঁর তৈরী ছবির অভিঘাত ও ভারতীয় চলচ্চিত্রে্র ক্ষেত্রে তাঁর অবদান কী, এ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করা সমুদ্রে বালতি করে জল ঢালার মতই অর্থহীন। তাঁর অশেষ প্রতিভার হিমশৈলের চূড়াটুকু আমরা দেখতে পাই তাঁর দুই অল্টার ইগ্‌ ফেলুদা ও প্রফেসর শুঙ্কু এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন খানিক পরে, বয়স তখন প্রায় ৪০। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর চারণভূমি ছিলো মূলত শিশু-কিশোরদের সরল মন। তাদের কথা ভেবেই লিখেছেন একের পর এক কল্পবিজ্ঞান, horror, thriller ধারার গল্প, এবং অবশ্যই ফেলুদা, শঙ্কু চরিত্র। মৌলিক রচনা ছাড়াও বেশ কিছু বিদেশী কাহিনীর অনুবাদও করেছেন।

‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ প্রচ্ছদ

এসবই বহুলচর্চিত, সকলেরই জানা। কিন্তু ইলাস্ট্রেটর এবং হরফশিল্পী হিসেবে তিনি আমাদের যতটা সমৃদ্ধ করেছেন তার তুলনায় তাঁর সেই সত্তাটি ততটা এক্সপ্লোর করা হয়েছে বলে মনে হয় না। যাঁর নামে কলকাতা শহরে একটা আস্ত সরকারি ফিল্ম স্কুল প্রতিষ্ঠিত, সেই সত্যজিৎ নিজে কিন্তু ছিলেন অর্থনীতি ও চারুকলার ছাত্র। কোনও প্রথগত ফিল্ম স্কুলিংই তাঁর ছিলো না। বস্তুত সিনেমার সত্যজিৎ যে একরকম চারুকলা শিল্পী সত্যজিৎ-এরই এক সৃষ্টি তা বললেও অত্যুক্তি হয় না।

বনেদী পরিবারের সন্তান। দাদু উপেন্দ্রকিশোর নিজের নক্সায় নির্মিত বাড়িতেই নির্মাণ করেছিলেন ছাপাখানা। বাড়ির দেওয়ালে রোমান হরফে লেখা থাকতো ইউ রায় এন্ড সন্স, প্রিন্টারস এন্ড ব্লক মেকারস। বাবা সুকুমার রায়ের সৃষ্টি আবোল তাবোলেও প্রতিটি চরিত্রের মান্য ইলাস্ট্রেশনগুলি আলাদা মাত্রা যোগ করে। সেই বহমান জিনিয়াস নিয়ম মেনেই সত্যজিৎ-এর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তাঁর শৈশব থেকে কৈশোর অতিবাহিত হয় অসামান্য এনরিচমেন্টের মধ্যে, নিয়ত গান-বাজনা, পড়াশোনা, সাহিত্য চর্চা, ছবি আঁকার আবহেই বেড়ে উঠছিলেন তিনি। সিনেমার টেকনিকাল ভাষায় ভবিষ্যতের সত্যজিৎ-এর প্রি-প্রোডাকশন চলছিলো।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত এক্ষণের প্রচ্ছদ

প্রেসিডেন্সি থেকে স্নাতক হয়ে মায়ের ইচ্ছেতে শান্তিনিকেতনে যান চারুকলায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে। গুরু হিসেবে পান আরও দুই জিনিয়াস নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়কে।

অতঃপর বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি.জে কিমারে যোগ দেন। সেখানেই শুরু পেশাদারী প্রচ্ছদ ডিজাইন, হরফশিল্প ও অন্যান্য নানান অলংকরণের কাজ। জাহাজপথে লন্ডন যাত্রাকালেই তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন তিনি। জাহাজেই সিগনেট প্রেসের হয়ে ‘আম আঁটির ভেঁপু’-র প্রচ্ছদ অঙ্কণের ফরমায়েসি কাজ করতে করতেই তিনি ছবির স্ক্রিপ্টের ব্লু প্রিন্ট মাথায় তৈরী করতে শুরু করেন। সেই যাত্রায়, লন্ডনে পৌঁছে অনেকগুলি ছবি (সিনেমা) দেখেন, তাঁর মনে সবচাইতে বেশী রেখাপাত করে ডি সিকার ছবি ‘বাইকেল থিভস’। ফেরার পথেই শেষ করেন ‘পথের পাঁচালি’র স্ক্রিপ্ট আর স্টোরি বোর্ডিং-য়ের কাজ। পরবর্তীতে, নিয়ত প্রতিকূলতার মধ্যেও অদম্য জেদ আর অসমসাহসী মনোভাব নিয়ে শেষ করেন তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’। স্ত্রী-এর গয়না বন্ধক দিয়ে, নিজের শেষ কপর্দকটুকুও খরচ করার পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সহায়তায় ছবির কাজ শেষ করেন। তারপরের ঘটনা প্রবাহ সর্বজন বিদিত।

জিম করবেটের বইয়ের প্রচ্ছদ

শিল্পী সত্যজিৎ-এর কিছু উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে অন্যতম হলো জওহরলাল নেহর বিরচিত ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া ও জিম করবেটের ম্যান ইটার্স অব কুমায়ুনের প্রচ্ছদ অলংকরণ।
তাছাড়া তৈরী করেছেন অজস্র বিখ্যাত বিজ্ঞাপনী পোস্টার, ইংরেজি ও বাংলা হরফ বা ফন্ট। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রে বিজার’ ফন্ট।

ডিসকভারি অব ইন্ডিয়ার প্রচ্ছদ

পরিশেষে আরও একবার মহান স্রষ্টাকে প্রণাম জানাই। এরকম বহুমূখী প্রতিভা সম্পন্ন বৈদুর্য্য মণি পেতে জাতি হিসেবে আমাদের আর কত বছর যে অপেক্ষা করতে হবে তার উত্তর হয়তো কালের গর্ভেই নিহিত আছে হয়তো।